আইএমএফের পূর্বাভাস: চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.৫ শতাংশ
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এ পূর্বাভাস তুলে ধরে। এটি সরকারের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক।

এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে, গত অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধি আরও কমতে পারে
আইএমএফের মতে, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট অব্যাহত থাকলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। তবে কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূরীকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত
সরকারের অনুরোধে সম্ভাব্য নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের প্রতিনিধি দল ১২ জুলাই ঢাকায় আসে। সফরের শেষ দিনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিনিধি দলের সমাপনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিস্থিতি, সরকারের সংস্কার অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।
আইএমএফ জানায়, নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার, পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে আগামী কয়েক মাস আলোচনা চলবে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি থেকে পাঁচ কিস্তি গ্রহণের পর উভয় পক্ষের সম্মতিতে সেটি বাতিল করা হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই সংস্কার
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির ভিত্তি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান রেখেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাত বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকা সফরকারী আইএমএফ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির কর্মকর্তা ইভো ক্রজনার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিগত অগ্রাধিকার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও রাজস্ব সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনও শক্তিশালী রয়েছে, তবুও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
রাজস্ব সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর
আইএমএফের মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাব থেকে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সংস্থাটি আরও মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখা উচিত।
আর্টিকেল-৪ প্রতিবেদনের সুপারিশ
আইএমএফ জানায়, এবারের আলোচনা ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ প্রতিবেদনে উল্লেখিত নীতিগত সুপারিশকে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সার ও বিদ্যুতের ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে মূল্য সমন্বয়ের কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উৎসাহিত করতে বর্তমানে চালু থাকা আড়াই শতাংশ প্রণোদনা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
