মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে কাতারের দোহায় যখন ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় হরমুজ প্রণালির কাছে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এ ঘটনাকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ফের তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। তবে হামলার নির্দিষ্ট স্থান বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে, ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
সেন্টকমের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স আল জাজিরাকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, সোমবার গভীর রাতে চালানো অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন স্থাপনের প্রস্তুতিতে থাকা ইরানি নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তার দাবি, যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও মার্কিন বাহিনী নিজেদের সেনাদের সুরক্ষায় ‘সংযত আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ গ্রহণ করছে।
বর্তমানে ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালির কাছে ইরান মাইন স্থাপন করছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ভারতের জয়পুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা “ভালোভাবেই” এগোচ্ছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, “চুক্তি হলে তা সবার জন্য ইতিবাচক হবে, আর না হলে পরিস্থিতি আবার যুদ্ধের দিকে যেতে পারে।”

ইরানের তেহরানে ইমাম খোমেনী গ্র্যান্ড মসজিদে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে নিহতদের ও সশস্ত্র বাহিনীকে সম্মান জানাতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সরকারের সমর্থকেরা। ছবি: এপি
ইরানের প্রতিক্রিয়া
বন্দর ব্বাসে মার্কিন হামলার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি ইরান। তবে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। পাশাপাশি একটি আরকিউ-৪ ড্রোন ও একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি চালানোর কথাও জানানো হয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব দেওয়ার “বৈধ ও নিশ্চিত অধিকার” তাদের রয়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন হামলার আগে আইআরজিসি সাগরে একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং বন্দর আব্বাসে হামলায় কয়েকজন আইআরজিসি সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও এখনই চূড়ান্ত চুক্তির দাবি করা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং যুদ্ধ বন্ধ করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
কূটনৈতিক তৎপরতা
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও এখনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর মধ্যে কাতারের দোহায় পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মতি-এর নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই চুক্তির আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।

শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সিনিয়র অ্যাডভাইজার মার্ক ক্যানসিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলাটি ছিল সীমিত পরিসরের। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
সিএসআইএস-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান সতর্ক করেছেন, ইরানের প্রতিশোধমূলক অবস্থান চলমান শান্তি আলোচনা ভেস্তে দিতে পারে। একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন
সূত্র: আল জাজিরা
