গবাদি পশুর মাংস বিক্রি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত কী?
গরু, মোষ সহ গবাদি পশু জবাই করে কাটা ও মাংস বিক্রি করা নিয়ে পুরোনো একটি আইন নতুন করে বলবৎ করার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সরকার।
১৯৫০ সালের প্রাণীসম্পদ সুরক্ষা আইন অনুযায়ী প্রকাশ্যে গবাদিপশু জবাই ও মাংস বিক্রির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিনিষেধ নতুন করে কার্যকর করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনও গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। পাশাপাশি প্রকাশ্যে পশু জবাই, মাংস কাটা ও বিক্রির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী–এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের দাবি, আইনটি বহু আগেই প্রণয়ন করা হলেও দীর্ঘদিন তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এখন জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যবিধি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। গবাদিপশুর মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক ব্যবসায়ী ও পাইকারি বিক্রেতার আশঙ্কা, নতুন বিধিনিষেধের কারণে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এই নির্দেশনা জারি হওয়ায় পশুর হাট, কসাইখানা এবং মাংসের বাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের নামে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র মাংস বিক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে এই আইন কার্যকর করতে গাফিলতি করা হয়েছিল, ফলে অবৈধভাবে পশু জবাই ও মাংস বিক্রির ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল।
নতুন নির্দেশিকায় কী বলা হয়েছে?
ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য, যেখানে গরুর মাংস বিক্রি ও ভক্ষণে সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। রাজ্যের বিভিন্ন বাজার, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় সহজেই গোমাংস পাওয়া যায়, যা ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বহু রাজ্যের তুলনায় ভিন্ন বাস্তবতা।
তবে বর্তমান সরকার স্পষ্ট করেছে, তারা নতুন কোনও আইন প্রণয়ন করছে না; বরং ১৯৫০ সালের বিদ্যমান প্রাণীসম্পদ সুরক্ষা আইন আরও কঠোরভাবে কার্যকর করছে। এই আইনের আওতায় পশু জবাইয়ের আগে প্রশাসনিক অনুমতি, নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং নির্দিষ্ট স্থানে মাংস বিক্রির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ জবাই রোধ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তবে সমালোচকদের মতে, ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল একটি সময়ের আগে এমন নির্দেশনা জারি করায় রাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
এই আইনে বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী গবাদিপশু জবাই বা বলি দেওয়া যাবে না। পশুর মাংস কাটা ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন বা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণীসম্পদ দফতরের অনুমোদিত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী ‘গবাদিপশু’ বলতে ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর এবং মহিষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে পশুটি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করবেন—তার বয়স ১৪ বছরের বেশি কি না।
যদি পশুটি নির্ধারিত বয়সের নিচে হয়, অথবা সেটি বিকলাঙ্গ বা প্রজনন অক্ষম হয়, তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে জবাইয়ের অনুমতিপত্র (সার্টিফিকেট) ইস্যু করা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই যদি কোনো কর্মকর্তা অনুমতি না দেন, তাহলে পশুর মালিক রাজ্য সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
এই বিধান সব ধর্মীয় বলি প্রথা এবং বাণিজ্যিক মাংস বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এটি নতুন আইন নয়; এর আগেও ২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী রাজ্য সরকার এই বিধি কার্যকর করেছিল।
এছাড়া সরকার আরও কিছু স্বাস্থ্য ও হাইজিন সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে—মাংস ঢেকে রাখা অবস্থায় বিক্রি করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বাসি মাংস বিক্রি না করা।

বিক্রিতে কী প্রভাব?
বিজেপির দাবি, পশ্চিমবঙ্গে গোমাংস বিক্রি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। সম্প্রতি ক্যানিং পূর্ব বিধানসভার এক বিজেপি নেতা আলিউল পেয়দা জীবনতলা বাজারে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন যে, গোমাংস বিক্রিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তাঁর মতে, “শুধু স্বাস্থ্যবিধি ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা নয়।”
কলকাতার পার্ক স্ট্রিটসহ বিভিন্ন মোগলাই, চাইনিজ ও মাল্টিকুইজিন রেস্তোরাঁয় গোমাংসের সরবরাহ ও বিক্রি এখনো স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক রেস্তোরাঁ মালিক। তবে উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি ভিন্ন।
সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ভুটান সীমান্তবর্তী জয়গাঁওয়ে একটি গোমাংসের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে মূলত ভুটানি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ক্রেতারা নির্ভর করতেন। অন্যদিকে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মিট মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে গোমাংসের স্বাভাবিক বাণিজ্য চলছে।
খাদ্য গবেষক ও ভ্লগার ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ীর মতে, অনেক জায়গায় প্রকাশ্যে রাস্তার পাশে মাংস বিক্রি স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী যথেষ্ট নয়। তবে তিনি মনে করেন, সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে এই নিয়ম কার্যকর করতে পারে, তাহলে এতে আপত্তির তেমন সুযোগ নেই।
হুগলি জেলার এক গোমাংস ব্যবসায়ী জানান, শহরাঞ্চলে চাহিদা বেশি থাকায় টাটকা মাংস দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়, কিন্তু শহরতলি এলাকায় বিক্রির গতি তুলনামূলকভাবে কম। তাঁর মতে, নতুন স্বাস্থ্যবিধি মানতে হলে মজুত ও বিক্রির ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে, নাহলে ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
