বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আর আধিপত্যের লড়াইয়ের মাঝে বেইজিংয়ে হয়ে গেল এক হাই-ভোল্টেজ কূটনৈতিক বৈঠক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর এবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথেয়তা দিল চীন। বিশ্লেষকদের মতে, পর পর দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতাকে বেইজিংয়ে এনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ আরও একধাপ শক্ত করল শি জিনপিং প্রশাসন। তবে পুতিনের এই হাই-প্রোফাইল সফরের আড়ালে রাশিয়ার ঝুলিতে বড় কোনো সুনির্দিষ্ট অর্জন আসেনি বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

সংহতির আড়ালে অধরাই রইল 'সাইবেরিয়া-২' পাইপলাইন
দুই দেশের পক্ষ থেকে বাইরে গভীর বন্ধুত্ব আর একতার বার্তা দেওয়া হলেও, রাশিয়ার জন্য এই সফরটি আশানুরূপ ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষ করে মস্কোর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত মেগা প্রজেক্ট 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া ২' (Power of Siberia 2) গ্যাস পাইপলাইন চুক্তিটি এবারও আলোর মুখ দেখেনি।
তবে বড় কোনো চুক্তি না হলেও, চীনা পর্যবেক্ষকদের দাবি—এই সফর বেইজিং ও মস্কোর যৌথভাবে একটি ‘বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা’ (Multipolar World Order) গড়ে তোলার লড়াইকে আরও বেগবান করবে। যদিও এই সম্পর্কের আড়ালে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতার অসমতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যেখানে চালকের আসনে রয়েছে চীন।
ওয়াশিংটন-মস্কো দ্বন্দ্বে সুবিধাজনক অবস্থানে বেইজিং
ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর রাশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ঝাং শিন এই ত্রিপক্ষীয় সমীকরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ট্রাম্প ও পুতিনের পর পর বেইজিং সফরের পর চীন এখন অনেক সুবিধাজনক ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন:
"রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের এই চীন সফর কেবল প্রতীকী কোনো ঘটনা নয়। বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ট্রিপল-অ্যাক্সিস বা এই ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের সুতা এখন মূলত বেইজিংয়ের হাতে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যে একটি "কৌশলগত স্থিতিশীলতার গঠনমূলক সম্পর্ক" গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, পুতিন ও শি জিনপিং চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দাবি করে আসছেন।
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যৌথ বার্তা
গত বুধবার শি-পুতিন বৈঠকের মূল আকর্ষণ ছিল একটি যৌথ ঘোষণা, যেখানে একটি বহুমুখী বিশ্বের উত্থান এবং এক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করা হয়।
সাংহাই একাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেসের রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া বিশেষজ্ঞ লি লিফান মনে করেন, এই ঘোষণাটি বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলেরই অংশ। চীন বরাবরই পশ্চিমা আধিপত্যবাদ এবং মার্কিন ব্লকের রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছে। গ্লোবাল সাউথ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে চীনের সাম্প্রতিক নীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে এই যৌথ ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করবে।
পাইপলাইন চুক্তি নিয়ে চীনের 'ধীরে চলো' নীতি
ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের জেরে ধারণা করা হচ্ছিল, এবার হয়তো 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া ২' পাইপলাইন চুক্তিটি চূড়ান্ত হবে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত রাশিয়ার জন্য এই চুক্তিটি অত্যন্ত জরুরি হলেও, বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীন এখনই তাড়াহুড়ো করতে নারাজ। ২০০৬ সালে প্রস্তাবিত এই পাইপলাইনটি রাশিয়ার ইয়ামাল উপদ্বীপের গ্যাস ক্ষেত্রকে মঙ্গোলিয়ার ওপর দিয়ে উত্তর চীনের সাথে যুক্ত করার কথা থাকলেও গ্যাসের দাম ও অর্থায়ন নিয়ে দুই দেশের বিরোধ কাটেনি।
অধ্যাপক ঝাংয়ের মতে, চীন গত কয়েক দশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে এবং তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশ থেকে গ্যাস এনে তাদের জ্বালানি খাতকে বহুমুখী করেছে। ফলে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর বেইজিংয়ের কোনো জরুরি বা অন্ধ নির্ভরতা নেই। চীন এখানে পুরোপুরি ব্যবসায়িক ও দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করেই দরকষাকষি করছে।
অবশ্য ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, পাইপলাইনের রুট ও নির্মাণশৈলী নিয়ে দুই দেশ একটি সাধারণ বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে। আগামী নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে অনুষ্ঠিতব্য অ্যাপেক (APEC) শীর্ষ সম্মেলনের আগে দুই পক্ষ একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকে (MoU) সই করতে পারে।

৪০ চুক্তির বেশির ভাগই প্রতীকী, তবে রেলপথে বড় অগ্রগতি
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪০টি চুক্তি ও নথি স্বাক্ষরিত হলেও এর অর্ধেকেরও বেশি ছিল অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারক (Non-binding MoU), যা মূলত কেবল কূটনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ।
তবে অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতে একটি বড় সাফল্য এসেছে। রাশিয়ার জাবাইকালস্ক এবং চীনের বৃহত্তম স্থল বন্দর মাঞ্জৌলির (ইনার মঙ্গোলিয়া) মধ্যে একটি নতুন আন্তঃসীমান্ত রেলপথ নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। বর্তমানে দুই দেশের রেললাইনের ট্র্যাক গেজ ভিন্ন হওয়ায় সীমান্তে পণ্য খালাস করে আবার নতুন ট্রেনে লোড করতে হয়, যা বেশ সময়সাপেক্ষ। নতুন রেলপথটি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড গেজে তৈরি করা হবে, যা চীনের মূল রেল নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে এই রুটের পণ্য পরিবহন ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
