মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আসছে নতুন কর, বাড়তে পারে রাজস্ব চাপ!

মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আসছে নতুন কর, বাড়তে পারে রাজস্ব চাপ!

             দেশে প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়করের (এআইটি) আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসি অনুযায়ী বছরে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে। একইসঙ্গে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়নভেদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপরও আরোপ হতে পারে বার্ষিক কর।

          বিশ্লেষকদের মতে, সরকার একদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে করের আওতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর, যাদের বড় একটি অংশ জীবিকা নির্বাহের জন্য মোটরসাইকেল কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল।


বাজেট বৈঠকে নতুন করের আলোচনা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, সোমবার (১১ মে) অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বাজেট-সংক্রান্ত বৈঠকে এনবিআর মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব তোলে। পাশাপাশি উচ্চ সিসির বিলাসবহুল গাড়ির বিদ্যমান কর বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিলাসবহুল ভোগ ও উচ্চমূল্যের যানবাহন থেকে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কম সিসির সাধারণ মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।

কোন বাইকে কত কর?

বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকদের নিবন্ধন ফি ও রোড ট্যাক্স দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এর সঙ্গে যুক্ত হবে অগ্রিম আয়করও।

এনবিআরের খসড়া অনুযায়ী—

  • ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল করমুক্ত রাখা হতে পারে
  • ১১১ থেকে ১২৫ সিসি মোটরসাইকেলে বছরে ২ হাজার টাকা
  • ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি মোটরসাইকেলে বছরে ৫ হাজার টাকা
  • ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে বছরে ১০ হাজার টাকা কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৩৮ লাখ মোটরসাইকেল করযোগ্য সীমার আওতায় পড়তে পারে।

গড়ে প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে ৪ হাজার টাকা করে কর আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে সরকার।


কেন বাড়ানো হচ্ছে কর?

এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং বর্তমানে তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম।

সাবেক আয়কর কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, অগ্রিম আয়কর চালু হলে করদাতাদের তথ্যভান্ডার বড় হবে এবং আর্থিক স্বচ্ছতাও বাড়বে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব পাওয়া সহজ হবে।

তবে তার মতে, জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবহৃত সাধারণ মোটরসাইকেলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করাই উচিত।


মোটরসাইকেল এখন জীবিকার প্রধান মাধ্যম

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় মোটরসাইকেলকে বিলাসপণ্য হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে এটি লাখো মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাইড শেয়ারিং, কুরিয়ার, ডেলিভারি সার্ভিস, ওষুধ সরবরাহ, বিক্রয় প্রতিনিধি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বহু খাত এখন মোটরসাইকেলনির্ভর। ঢাকার এক রাইড শেয়ার চালক বলেন, “১২৫ সিসির বাইক চালিয়ে সংসার চালাই। জ্বালানি, সার্ভিসিং ও যন্ত্রাংশের খরচ আগেই বেড়েছে। এখন নতুন করে কর বসলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।”

তার আশঙ্কা, করের কারণে মানুষ কম সিসির মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।


মোটরসাইকেল শিল্পেও প্রভাবের শঙ্কা

গত এক দশকে দেশে মোটরসাইকেল শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়েছে। বর্তমানে হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ, টিভিএস-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল দেশে সংযোজন করা হচ্ছে।খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন কর আরোপ হলে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমে যেতে পারে। এতে শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

একটি শীর্ষ মোটরসাইকেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, “৬-৭ লাখ টাকার বাইক যারা কেনেন, তাদের জন্য কর বড় বিষয় নয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষের জন্য বছরে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে।”


বিলাসবহুল গাড়িও নজরদারিতে

শুধু মোটরসাইকেল নয়, উচ্চ সিসির বিলাসবহুল গাড়ির ওপরও কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এসইউভি নিবন্ধিত রয়েছে, যার বড় একটি অংশের ইঞ্জিন ক্ষমতা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার সিসির বেশি।

এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের তদন্তে ৩ হাজার সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত ৫ হাজার ২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, মূল লক্ষ্য ‘লাক্সারি সেগমেন্ট’ থেকে বেশি কর আদায় করা।


করের আওতায় আসছে ‘বাংলার টেসলা’

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা—যাকে অনেকে ‘বাংলার টেসলা’ বলেও উল্লেখ করেন—সেগুলোকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এনবিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী—

  • সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা
  • পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা
  • ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ১ হাজার টাকা কর আরোপ করা হতে পারে

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে, যার বড় অংশই অনিবন্ধিত।গত বছর সরকার ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করে, যেখানে নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়।

তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যেসব যানবাহনের সঠিক হিসাবই সরকারের কাছে নেই, সেগুলো থেকে বাস্তবে কীভাবে কর আদায় করা হবে?

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ Zahid Hussain বলেন, “যার মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য আছে, তার কিছু কর দেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার বড় অংশ অনিবন্ধিত হওয়ায় সেখানে কর আদায় বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।”


আয়কর রিটার্নে সমন্বয়ের সুযোগ

আয়কর আইন অনুযায়ী, এই অগ্রিম আয়কর পরবর্তী সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয় করা যাবে। অর্থাৎ বছরে দেওয়া অগ্রিম কর চূড়ান্ত কর হিসাব থেকে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, যারা নিয়মিত আয়কর রিটার্নই জমা দেন না, তাদের জন্য এই সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে।

এনবিআরের প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আগামী বাজেট ঘোষণার সময় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজস্ব বাড়ানোর চাপে সরকার এখন এমন খাতগুলোকেও করের আওতায় আনতে চাইছে, যেগুলো এতদিন তুলনামূলকভাবে করমুক্ত ছিল। আর সেই তালিকায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে দেশের লাখো মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।


Leave a Reply

Cancel Reply

Your email address will not be published.

Follow US

VOTE FOR CHAMPION

Top Categories

Recent Comment

  • user by Anonymous

    Good luck Atoz news

    quoto
  • user by আব্দুল আলীম সরকার

    আপনাদের খবরগুলো ভালো

    quoto

Please Accept Cookies for Better Performance