বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ নামে নতুন একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে ইরান। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় এখন থেকে প্রণালিটি ব্যবহারকারী প্রতিটি জাহাজকে তেহরানের নির্ধারিত কঠোর আর্থিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত মেনে চলতে হবে। অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের জন্য এই উদ্যোগ বড় ধরনের রাজস্ব আয়ের পথও খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কী এই নতুন কর্তৃপক্ষ?
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্যই এই নতুন কাঠামো চালু করা হয়েছে। এখন থেকে এই প্রণালি অতিক্রম করতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোকে আগে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্ধারিত নিয়ম ও শর্ত জেনে নিতে হবে। ট্রানজিট পারমিট পেতে হলে তেহরানের নির্ধারিত কাঠামোর সঙ্গে জাহাজ পরিচালনা ও নথিপত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
কেন ‘পারসিয়ান গালফ’ নাম ব্যবহারে জোর?
পারমিট পেতে জাহাজগুলোকে বেশ কিছু কঠোর শর্ত মানতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, সামুদ্রিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও অফিসিয়াল চিঠিপত্রে এই জলপথকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘পারসিয়ান গালফ’ বা ‘পারস্য উপসাগর’ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। যদিও অনেক আরব দেশ একে ‘আরবিয়ান গালফ’ বা শুধু ‘গালফ’ বলে উল্লেখ করে থাকে, ইরান তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে সংস্থাটি বলেছে, “শুধু ‘গালফ’ শব্দটি গ্রহণযোগ্য নয়; পূর্ণ নাম ‘পারসিয়ান গালফ’ ব্যবহার করতে হবে।”
কীভাবে পার হবে জাহাজ?
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব ভার্চুয়াল মিডিয়ার তথ্যমতে, ট্রানজিট অনুমতি পেতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—সেবামূল্য বা ফি পরিশোধে ইরানের মুদ্রা রিয়ালকে অগ্রাধিকার দেওয়া, ইরানি ব্যাংক থেকে গ্যারান্টি লেটার সংগ্রহ এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান। এই ক্ষতিপূরণের শর্ত মূলত ইরানের ভাষায় ‘আক্রমণকারী দেশগুলোর’ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
এছাড়া যেসব দেশ ইরানের সম্পদ জব্দ করেছে বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের জাহাজ চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। নতুন নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজ জব্দ করা হবে এবং কার্গোর মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
বৈশ্বিক গুরুত্ব কতটা?
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো বিধিনিষেধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকেই ইরান এখানে জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ শুরু করে। যদিও কিছু মিত্র দেশকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় বা চলাচলে বাধা দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে যুদ্ধাবস্থার বাস্তবতায় ইরান এখন কার্যত নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩৮টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছে জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে শুরু করা মার্কিন নৌ-অভিযান আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
ইরানের লক্ষ্য ও সম্ভাব্য আয়
আইআরজিসি নেভি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখা জানিয়েছে, ইরান নির্ধারিত রুটই বর্তমানে হরমুজ প্রণালির একমাত্র নিরাপদ পথ। এই রুট অমান্য করলে ‘চূড়ান্ত ব্যবস্থা’ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
এদিকে ইরানি পার্লামেন্টে একটি নতুন বিল বিবেচনায় রয়েছে, যা পাস হলে ইসরায়েলি জাহাজের চলাচল স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হতে পারে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ‘শত্রু দেশ’গুলোর জাহাজকে যুদ্ধক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রণালি ব্যবহার করতে হতে পারে।
তবে ইরানি রিয়ালের তীব্র মূল্যপতনের কারণে বিদেশি জাহাজগুলোর জন্য রিয়ালে অর্থ পরিশোধ জটিল হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান প্রায় ১৮ লাখে পৌঁছেছে।
ইরান-ইরাক যৌথ চেম্বার অব কমার্সের প্রধান Yahya Al-e Eshaq বলেছেন, সার্ভিস ফি ও টোল আদায়ের মাধ্যমে ইরান বছরে ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে। অন্যদিকে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু জাহাজের কাছ থেকে ইরান ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি দাবি করছে।
সূত্র: আল-মনিটর
