হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ: যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করল ইরান, আলোচনার কথা স্বীকার দুই পক্ষের
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে তেহরান। একই সময়ে, দুই দেশের মধ্যে চলমান যোগাযোগ ও আলোচনার বিষয়টিও উভয় পক্ষ নিশ্চিত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জোরপূর্বক নতুন একটি নৌপথ চালুর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার লঙ্ঘন এবং এর ফলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
শনিবার ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, জুনে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য ট্রানজিট রুট ও প্রয়োজনীয় পদ্ধতি নির্ধারণের অধিকার তেহরানের রয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন কোনো নৌপথ চালু করার আগে ওয়াশিংটনের উচিত ছিল তেহরানের সঙ্গে পরামর্শ করা। এ ধরনের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুই পক্ষ সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

২৪ জুলাই, ২০২৬ তারিখে ইরানের তেহরানে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিকৃতি অঙ্কিত একটি ম্যুরালের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছেন [এএফপি]
দুই সপ্তাহ পর ইরানে তুলনামূলক শান্ত রাত
ইরান জানিয়েছে, গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো শনিবার ভোর পর্যন্ত দেশটির প্রধান শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নতুন সরাসরি হামলা হয়নি।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রেসুল সেরদার জানান, টানা প্রায় দুই সপ্তাহের রাতভর হামলার পর শনিবার রাতে ইরানে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ‘ইরানে একটি শান্তিপূর্ণ রাত কেটেছে।’
আলোচনায় আগ্রহের ইঙ্গিত ট্রাম্পের
এদিকে ইরানে নতুন করে ‘বড় ধরনের’ হামলা চালানোর আগের হুমকি থেকে কিছুটা সরে এসে আলোচনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার রাতে তিনি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে ইরান এখনো চুক্তির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানি কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কিছু প্রস্তাব তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনও মৌলিক পার্থক্য ও গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। ফলে আলোচনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
হরমুজ নিয়ে মূল বিরোধ
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল এখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান বিরোধের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ইরানের দাবি, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল তদারকির অধিকার তেহরানের রয়েছে। দেশটি জাহাজগুলোকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত রুট ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।
ইরানি বাহিনী প্রণালীতে নিজেদের নির্ধারিত ব্যবস্থা লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েকটি জাহাজে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অবরোধ আরোপ করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স জানিয়েছেন, অবরোধ অমান্য করে বারবার চলাচলের চেষ্টা করা একটি ট্যাংকারকে যুক্তরাষ্ট্র ‘অক্ষম’ করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ১৪ জুলাই অবরোধ পুনর্বহালের পর তারা ১২টি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং আরও একটি জাহাজকে অচল করে দিয়েছে।
অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ভলফগ্যাং পুশতাইয়ের মতে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক পদক্ষেপ—এই তিনটি কৌশল ব্যবহার করছে।
সংঘাতে জড়িয়েছে হুথিরাও
ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালীতেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
শুক্রবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যৌথ বাহিনী ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ শহরে হামলার দায় স্বীকার করে। তারা দাবি করেছে, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করছিল।
এর পরদিন সৌদি আরবের ইয়ানবু ও জিজান প্রদেশে একাধিকবার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এই দুই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা রয়েছে।
হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাদের যোদ্ধারা ওই এলাকায় সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্ভাব্য বিপদের কারণে সাইরেন বাজানো হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ, পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার একটি সম্ভাবনা এখনও তৈরি হয়েছে।
তথ্য-সূত্রঃ আল জাজিরা
