‘ককরোচদের’ বিজয়, মোদির জন্য কি নতুন রাজনৈতিক সংকেত?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে অন্যতম বড় গণআন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা এমন একটি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা, যে সরকার দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধিতাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলার ভাবমূর্তি ধরে রেখেছে।
সংগৃহীত ছবি
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত একটি তরুণদের প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন। পরে এই আন্দোলন দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভে লাখ লাখ তরুণ অংশ নেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরও আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রথমদিকে আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি তরুণদের উদ্দেশে কথা বলেন এবং তাদের ‘গঠনমূলক পরামর্শের’ জন্য ধন্যবাদ জানান। তবে আন্দোলনকারীরা ওই বার্তাকে ইতিবাচকভাবে না নিয়ে বরং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে প্রতিবাদ আরও জোরদার করেন।
এর পরদিন শনিবার দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে। বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যেও আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের ব্যাপক সক্রিয়তা সরকারের প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের পাল্টা প্রচারণা
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং ব্যাপক অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখিয়েছে। তবে এবারের আন্দোলনে তরুণদের তৈরি মিম, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা প্রচারণা সরকারের সেই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদির তরুণদের উদ্দেশে দেওয়া ভিডিও বার্তাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকার হয়।
আন্দোলনের সময় ভারতের কয়েকটি মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। আন্দোলনের শুরুতে বিক্ষোভের খবর যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তি বা পাকিস্তানি গোষ্ঠীর মদত রয়েছে—এমন দাবি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। তবে আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব অভিযোগের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
‘সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না’
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অশুতোষ ভার্শনির মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের সামনে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। তার মতে, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো মোদি সরকার জনমত ও রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মন্ত্রীদের একজন। ফলে তার পদত্যাগ বিজেপির অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্য মন্ত্রীরাও নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিরোধী রাজনীতিতে নতুন গতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনে জয় পেয়ে বিজেপি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দলটি সেই ধাক্কা সামাল দেয়।
তবে তরুণদের এই আন্দোলন ভারতের বিরোধী রাজনীতিতেও নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের সমর্থনে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেন এবং পুলিশের বাধার মুখে পড়েন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থানে থাকা বিরোধী রাজনীতিতে এই আন্দোলন নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
ক্ষোভের পেছনে আরও বড় কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের তরুণদের ক্ষোভের কারণ শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেকারত্ব, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, স্থবির মজুরি এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট।
এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই আন্দোলন কি কেবল একটি নির্দিষ্ট ইস্যুকেন্দ্রিক বিক্ষোভ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে?
বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের আসন্ন নির্বাচন এবং ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, এটি তাদের শেষ নয়; বরং শুরু। তরুণদের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান।
সূত্র: আরএ
